Powered By Blogger

Monday, January 24, 2011

পুরান ঢাকা

পুরান ঢাকা—কারও কাছে আদি ঢাকা, কারও কাছে আসল ঢাকা। মোগল সুবার রাজধানীর গৌরব আর সৌরভের সবই ধারণ করে আছে নগরের ওই অংশটি। ঘুপচি-গলি আর জরাজীর্ণ ভবনের পুরান ঢাকাকে যাঁরা চেনেন, তাঁদের অগোচরে কিন্তু বদলেযাচ্ছে পুরান ঢাকা। বুড়িগঙ্গার তীরঘেঁষা এলাকাগুলো যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার চেষ্টা করছে পুরোদমে।
পুরান ঢাকা নিয়ে যাঁরা নাক সিটকান, তাঁদের ‘লা জওয়াব’ করে দিতে এক ওয়ারীই যথেষ্ট। ওয়ারীর আধুনিকতার পালে অনেকটাই হাওয়া জুগিয়েছে এই এলাকার ফ্যাশন হাউসগুলো। ওয়ারীর বাসিন্দা মোহাম্মদ মোহসীন জানান, প্রায় ৪০ বছর আগেই ওয়ারীতে বেশ কয়েকটি টেইলার্স শপ ছিল। টেইলার্সগুলোয় দেশি পোশাকের পাশাপাশি পশ্চিমা পোশাক তৈরির দক্ষ দর্জি ছিলেন। গত এক দশকে এখানে গড়ে উঠেছে প্রায় গোটা পঞ্চাশেক ফ্যাশন হাউস। লক্ষ্মীবাজার থেকে গেন্ডারিয়ায় যাওয়ার পথে দুই পাশেও চোখে পড়ে বেশ কিছু ফ্যাশন হাউস ও গিফট শপ।
পুরান ঢাকার বদলের আরেক অনুষঙ্গ কিন্ডারগার্টেন স্কুল। আশির দশকে ওয়ারীতে গড়ে ওঠে বেশ কিছু কিন্ডারগার্টেন স্কুল। এরপর এ রকম অনেক স্কুল ছড়িয়ে পড়ে পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায়। আপাদমস্তক বিলেতি বাবু সেজে স্কুলে যাওয়ার দলে যুক্ত হয় ছোট্ট সোনামণিরা। পুরান ঢাকার শিক্ষা ক্ষেত্রে বড় পরিসরে সর্বশেষ সংযোজন লালবাগ মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ। বছর তিনেক আগে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে প্রতিষ্ঠিত এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এখনো সত্যিকারের মডেল বিদ্যাপীঠ হয়ে উঠতে পারেনি। তবে সে সম্ভাবনা হারিয়েও যায়নি। সে কথাই বলছিলেন লালবাগ মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ জাহাঙ্গীর আলম। তাঁর ভাষ্য, এ বিদ্যালয়ের অভিভাবক শিক্ষা মন্ত্রণালয়। সেখানকার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা যদি নজর রাখেন, তবেই এটি দাঁড়াতে পারবে।
বছর তিনেক আগে পুরান ঢাকায় আর যে জিনিসটা মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে, সেটা হচ্ছে জহির রায়হান সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। পুরান ঢাকার শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিকে জাগিয়ে তুলতে ডিসিসির উদ্যোগে গেন্ডারিয়ার লোহারপুলে গড়ে উঠেছে এটি। পুরান ঢাকার সংস্কৃতিচর্চা এগিয়ে নিতে জহির রায়হান সাংস্কৃতিক কেন্দ্র কতটুকু ভূমিকা পালন করছে, জানতে চাইলে বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের অনুষ্ঠান সম্পাদক চন্দন রেজা বলেন, ‘পুরান ঢাকার সংস্কৃতি বিকাশে কেন্দ্রটি একটি বড় ক্ষেত্র তৈরি করেছে। একে ব্যবহার করে আমরা পুরান ঢাকায় নাটকের দর্শক বাড়ানোর চেষ্টা করছি। এ ছাড়া স্থানীয় নাট্যদলগুলোকে মূল ধারার সংস্কৃতিতে যুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছি।’
আদি ঢাকার বাসিন্দাদের সুখ-দুঃখে একটা সময় বিশাল ভূমিকা রাখত এলাকার পঞ্চায়েত। ঢাকার নওয়াবদের আওতাধীন পঞ্চায়েতগুলো এখন আর নেই। ইদানীং আবার আদি বাসিন্দাদের পাশে দাঁড়াতে এগিয়ে আসছে এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন সংগঠন। এর মধ্যে ঢাকাইয়াদের বিপদে-আপদে পাশে দাঁড়াচ্ছে ঢাকা সমিতি, কলতাবাজার পঞ্চায়েত কমিটি, ফরাশগঞ্জের মাওলা বখ্শ সরদার ট্রাস্ট, লালবাগের আজাদ মুসলিম ক্লাব প্রভৃতি।
নগরের ভবন নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো একটা সময় শুধু ঢাকার নতুন নতুন এলাকায় ভবন নির্মাণেই আগ্রহী ছিল। একুশ শতকে এসে পুরান ঢাকায়ও তাদের দৃষ্টি পড়েছে। এ বিষয়ে রিহ্যাবের (রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ) সাংগঠনিক সম্পাদক আক্তার বিশ্বাস বলেন, পুরান ঢাকার ওয়ারীতে প্রথম বহুতল ভবন নির্মাণ শুরু হয়। এরপর লালবাগেও অনেক ভবন করেছে একাধিক গৃহায়ণ প্রতিষ্ঠান। এখন বেশি কাজ হচ্ছে গেন্ডারিয়া, কলতাবাজার ও টিকাটুলী এলাকায়।
আবাসন ছাড়াও নতুন ঢাকার শপিং মলগুলোর আদলে পুরান ঢাকায় বিপণিবিতানও গড়ে উঠছে।
পুরান ঢাকায় আবাসন ব্যবসায়ীদের কার্যক্রমকে আবার ভালো চোখে দেখছেন না ঐতিহ্যপ্রেমীরা। এ প্রসঙ্গে আরবান স্টাডি গ্রুপের প্রধান নির্বাহী তাইমুর ইসলাম বলেন, অনেক জায়গায় ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা ধ্বংস করে কিংবা এগুলোর ক্ষতি করে নতুন ভবন গড়া হচ্ছে। পুরান ঢাকায় নতুন ভবন তৈরি করতে দেওয়া ঠিক হচ্ছে না। আধুনিক বহুতল ভবন করতে না পারার ফলে বাড়ির মালিকদের যে অর্থনৈতিক ক্ষতি, তা পূরণের উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। একই রকম ঘটনায় উন্নত দেশগুলোয় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের জন্য প্রণয়ন করা হয়েছে ট্রান্সফার অব ডেভেলপমেন্ট রাইটস (টিডিআর)। এর আওতায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি অন্য এলাকার কোনো ভবনে সমপরিমাণ বা সমমূল্যের ভবন তৈরি করার অধিকার পান।
‘পুরান ঢাকাবান্ধব’ বহুতল ভবন গড়ার দাবি করলেন ফরাশগঞ্জের ঢাকা কেন্দ্রের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আজিম বখ্শ। তিনি বলেন, পুরান ঢাকা দীর্ঘদিন অবহেলিত ছিল। এখন আবার এর দিকে সবার নজর পড়ছে। বুড়িগঙ্গা রক্ষায় নানা উদ্যোগের কথা শোনা যাচ্ছে। পুরান ঢাকার ঐতিহ্য রক্ষায় কিছু কিছু কাজ হচ্ছে। এগুলো অবশ্যই ভালো দিক। অপরদিকে নতুন ঢাকায় যানজট ভয়াবহ আকার ধারণ করায় পুরান ঢাকার যানজট এখন সহনীয় মনে হয়। এটাও এক অর্থে ইতিবাচক। তিনি আরও বলেন, তরুণ প্রজন্মের আলোকচিত্রীরা, গবেষকেরা পুরান ঢাকা নিয়ে আগ্রহী। পুরান ঢাকায় ফাস্টফুড সংস্কৃতি শুরু হয়েছে। তার পরও পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী খাবারের দোকানগুলোর জনপ্রিয়তা কমেনি, বরং বাড়ছে।
পুরান ঢাকার অলিগলিতে গড়ে উঠেছে ফাস্টফুডের দোকান। এ ক্ষেত্রে এগিয়ে আছে লক্ষ্মীবাজার। সম্প্রতি ট্রান্সকম ফুডস লিমিটেডের উদ্যোগে সেখানে বসেছে চেইন রেস্তোরাঁ কেএফসির একটি শাখা। ঢাকাইয়ারা কীভাবে দেখছেন ভিন দেশি খাবারের এই আয়োজন, জানতে চাইলে ট্রান্সকম ফুডস লিমিটেডের নির্বাহী পরিচালক আক্কু চৌধুরী জানান, ঢাকার আদি বাসিন্দারা এমনিতেই ভোজনরসিক। খাবারের মান আর স্বাদে ঢাকাই খাবারগুলো খানদানি। ঢাকার খাদ্যসম্ভারে আধুনিক কিছু পদ যোগ করল কেএফসি।
পুরান ঢাকার সামাজিক-সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে নানা পরিবর্তনের বিষয়ে কথা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মাহবুবা নাসরীনের সঙ্গে। তিনি বলেন, রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি আর সাংস্কৃতিক দিকগুলোকে সমন্বয় করে ঢাকার বদলে যাওয়া বিষয়টা শুদ্ধভাবে করা যেত। যদি সমন্বয় না থাকে, তবে পুরান ঢাকার বদলে তেমন কোনো লাভ হবে না

No comments: